ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন। সংবিধান ও প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী, সাধারণ আসনের নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই সময়সীমা মাথায় রেখে রমজান মাসের মধ্যেই নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বুধবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ গণমাধ্যমকে জানান, কমিশন চায় ঈদের আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সম্পন্ন করতে। তিনি বলেন, আইনি কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হয়। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং সম্ভব হলে রোজার মধ্যেই ভোট আয়োজনের চেষ্টা থাকবে। ইসি কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন শেষ হলে এরপর উপ-নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। উপ-নির্বাচনের পর পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করেই নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকারের দিকে মনোযোগ দিতে চায়।
প্রচলিত আইন, বিশেষ করে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সাধারণ আসনে যে দল যতটি আসন পায়, সংরক্ষিত নারী আসনও সেই অনুপাতে বণ্টিত হয়। অর্থাৎ দলীয় ভিত্তিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই নারী আসন নির্ধারিত হয়। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কোনও দল যদি সাধারণ আসনে একাধিক আসন অর্জন না করে, তবে তারা সংরক্ষিত নারী আসন পায় না। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এককভাবে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়ন বা আসন পেতে পারেন না। ফলে সংরক্ষিত নারী আসন পুরোপুরি দলভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
এই পদ্ধতির ফলে সংসদে দলগুলোর শক্তির প্রতিফলন নারী সংরক্ষিত আসনেও প্রতিফলিত হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল স্বাভাবিকভাবেই বেশি সংখ্যক সংরক্ষিত নারী আসন পেয়ে থাকে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২৯৯টি আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত থাকায় ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের মাধ্যমেই আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং সেখান থেকেই ৯০ দিনের সময় গণনা শুরু হয়। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, বিএনপি সর্বাধিক ২০৯টি আসন অর্জন করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৬টি আসন এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পেয়েছে ২টি আসন।
এছাড়া একটি করে আসন পেয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণসংহতি আন্দোলন এবং খেলাফত মজলিস। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ মোট ৪১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েও কোনো আসনে জয়লাভ করতে পারেনি। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই এখন সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের হিসাব নির্ধারিত হবে। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৮৩ জন নারী প্রার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ২০ জন। তবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছেন সাতজন নারী প্রার্থী।
বিএনপির মনোনয়নে অংশ নেওয়া ছয়জন নারী প্রার্থী বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এছাড়া একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। নারীদের সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং জয়লাভের এই পরিসংখ্যান বিশ্লেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ সংরক্ষিত আসনের বাইরে সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের একটি আলাদা মাত্রা যোগ করে।
নির্বাচন কমিশনের সামনে এখন সময়সীমার বিষয়টি বড় বিবেচ্য। গেজেট প্রকাশের পর ৯০ দিনের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা থাকায় বিলম্বের সুযোগ নেই। রমজান মাস চলমান থাকলেও কমিশন প্রশাসনিক প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে নিতে চায়। ইসি কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, সময়মতো প্রক্রিয়া শেষ করতে হলে রোজার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করতে হতে পারে। কমিশনের দৃষ্টিতে এটি একটি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন, যেখানে সাধারণ ভোটার সরাসরি ভোট দেন না; বরং নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ভোট দিয়ে সংরক্ষিত নারী সদস্য নির্বাচন করেন। ফলে সাধারণ নির্বাচনের মতো ব্যাপক মাঠপর্যায়ের প্রচার-প্রচারণা বা নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন শেষ হলে নির্বাচন কমিশন উপ-নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হবে। যেসব আসনে নির্বাচন স্থগিত হয়েছে বা শূন্য রয়েছে, সেসব আসনে উপ-নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে। এর মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী সব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে স্থানীয় সরকার কাঠামোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। সংরক্ষিত নারী আসন নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সংসদে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ব্যবস্থার অংশ। সাধারণ আসনে জয়ী দলগুলোর অনুপাত অনুযায়ী নারী প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের মাধ্যমে সংসদে নারীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা এখনো নারী প্রতিনিধিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার জন্য জরুরি। সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এখন সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন আয়োজনই নির্বাচন কমিশনের অগ্রাধিকার। গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা থাকায় রমজানের মধ্যেই ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সাধারণ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে আনুপাতিক বণ্টন পদ্ধতিতে নারী আসন নির্ধারিত হবে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে।
ঈদের আগেই নির্বাচন সম্পন্ন করা গেলে জাতীয় সংসদের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো গঠন সম্পূর্ণ হবে। এরপর উপ-নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন তার পরবর্তী কার্যপরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে যাবে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রক্ষা হবে এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রক্রিয়াও দ্রুত সম্পন্ন হবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
Leave a Reply