মোঃ হারুন অর রশিদ মজুমদারঃ পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকে মহান সৃষ্টিকর্তা যুগে যুগে সমাজ, রাষ্ট্র তথা মানব জাতির কল্যাণ এবং মুক্তির জন্য যেসব মনিষী, দার্শনিক এবং রাষ্ট্রচিন্তাবিদদের পাঠিয়েছেন, জিয়াউর রহমান তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সেসব মহাপুরুষ বিভিন্ন ভূ-খন্ডে তাঁদের অবদানের জন্য ইতিহাসে আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন এবং থাকবেন। আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে গ্রীসে সক্রেটিস মানব সমাজের কল্যাণ এবং মুক্তির জন্য (Virtue of Knowledge) ‘জ্ঞানই পূণ্য’ এই মর্মবাণী প্রচার করেন। যদিও তাঁকে পরবর্তীতে হত্যা করা হয়। সক্রেটিসের শিষ্য প্লেটো বিষয়টি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে প্লেটো এ ঘটনা থেকে শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতা লাভ করে তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি রিপাবলিক’ এ ‘ন্যায় বিচার’ অনুসন্ধান করতে চেষ্টা করেন। প্লেটোর ভাষায়- ‘পৃথিবীতে সৃষ্টিকর্তা সব মানুষকে সব কাজ করার জন্য সৃষ্টি করেননি’। ‘ন্যায় বিচার (Justice)’ অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্লেটো ‘আদর্শ রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হন। প্লেটো বিশ্বাস করেন যোগ্যতা অনুযায়ী যার যা প্রাপ্য তা প্রদান করাই হল ‘ন্যায় ধর্ম’। প্লেটোর চিন্তা থেকেই ‘রাষ্ট্র’ শব্দটির প্রথম উদ্ভব হয়।
বাংলাদেশে জিয়া’র আর্বিভাব তেমনি একটি ঘটনা। এ ভূখন্ডের জন্য জিয়া ছিলেন সৃষ্টিকর্তার অনন্য উপহার। বাংলাদেশের মানুষ প্রথম জিয়া’কে জানতে পায় ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইথারে ভেসে আসা চার শব্দের সেই বাক্য- ‘আমি মেজর জিয়া বলছি’ যা পুরো জাতিকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহনে উদ্দীপ্ত করেছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়াই সর্বপ্রথম ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে রাতে বিদ্রোহ করেন এবং চট্রগ্রামে তাঁর অধিনস্থ সৈন্যদের নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’ এ নেতৃত্ব দেন। উপনিবেশ বিরোধী সংগ্রাম শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে জিয়া ছিলেন সর্বদা সচেষ্ট, যা পরবর্তীতে দেশ মাতৃকার বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্বের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত হয়।
‘জিয়া’ বাংলাদেশ রাষ্ট্র, সমাজ এবং ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। জিয়া বিশ্বাস করতেন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই তিনি তাঁর মেধা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও প্রজ্ঞাদিয়ে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য ও জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন হল এদেশের মাটি, মানুষ, গণতন্ত্র, উন্নয়ন- উৎপাদনের রাজনীতি এবং সর্বোপরি দেশের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। বেগম জিয়া মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন গণতন্ত্র ছাড়া কোন দেশ ও জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি স্টেট সিনেট ২০১১ সালে ২৪ মে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে সম্মানিত করেন” (মন্ডল)। খালেদা জিয়া সময়ের আবর্তনে একটি নাম – তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের উজ্জ্বল মুখ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের দৃষ্টিতে বেগম জিয়া ঐক্যের প্রতীক। অন্যায়, অনিয়ম, অবিচারের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কষ্ঠস্বর। স্বৈরাচার ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে আপোসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর এই অর্জন হঠাৎ করেই কিংবা এমনি এমনি হয়নি। এজন্য তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তিনি আজও জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজ পযর্ন্ত বেগম জিয়া ত্যাগের মহিমায় তাঁর জীবন মহিমান্বীত। তাঁর ভাষায় “বাংলাদেশ ভাল থাকলে, আমি ভাল থাকি”। “এ দেশের বাহিরে আমার কোন ঠিকানা নেই, এ দেশই আমার ঠিকানা”। বাংলাদেশ আজ এক চরম ক্লান্তিকাল অতিবাহিত করছে। এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ খালেদা জিয়ার মত নেত্রীকে খুঁজে ফিরে।
তারেক রহমান শুধু একটি নাম নয়, একটি অস্তিত্ব, একটি প্রতিষ্ঠান। পারিবারিক ঐতিহ্য, পিতার আদর্শ ও মাতার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের প্রভাব তাঁকে করেছে সমৃদ্ধ। এই সমৃদ্ধতা তারেক রহমানের জীবনে এক অনন্য সংযোজন। তারেক রহমান ছাড়া বাংলাদেশের ভবিষ্যত জাতীয়তাবাদী রাজনীতি অকল্পনীয়। আকস্মিক ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তারেক রহমানের আগমন ঘটেনি। বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পরিক্রমায় দলের প্রয়োজনে, দেশের প্রয়োজনে, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রয়োজনে নিজ গুণ ও কর্ম প্রচেষ্টায় তৃণমূল থেকে ধীরে ধীরে রাজনীতিতে তাঁর উত্থান হয়েছে। সময় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রয়োজনেই তারেক রহমানের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গৌরবময় পারিবারিক ঐতিহ্য তারেক রহমানকে জুগিয়েছে অনুপ্রেরণা, দিয়েছে আলোর পথ- কিন্তু রাজনীতিতে সংযোজন করেছেন তিনি নিজস্ব স্বকীয়তা। তারেক রহমান রাজনীতিকে শহীদ জিয়ার মতই রাজধানী কেন্দ্রীক প্রাসাদ রাজনীতির শৃংখল থেকে মুক্ত করে ছড়িয়ে দিয়েছেন গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে। বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষকে সম্পৃক্ত করেছেন জাতীয় ক্রিয়া-কলাপ এবং আশা আকঙ্খা বাস্তবায়নের স্বপ্ন ও সংগ্রামের সাথে, যা তাঁকে রাজনীতিতে অনন্য ভূমিকায় আসীন করেছে। বাংলাদেশের গ্রাম – গ্রামান্তরে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তারেক রহমান এক ‘আইকন’। আধিপত্যবাদ ও এদেশীয় ষড়যন্ত্রকারীদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূলে নাড়াঁ দেয় তারেক রহমানের তৃণমূল রাজনীতির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা সমস্ত শক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারেক রহমানের ওপর। কারণ বেগম খালেদা জিয়ার পর তারেক রহমানই একমাত্র রাজনৈতিক নেতা, যে ভবিষ্যতে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে বাংলাদেশকে রক্ষা করার ক্ষমতা রাখেন।
এই মিডিয়া অপপ্রচারের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, চমক লাগানো মিথ্যাচারের কল্পকাহিনী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে প্রচার করে তাঁর চরিত্র হনন এবং জনপ্রিয় ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপন করা।
তারই ধারাবাহিকতায় মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াকে ইতিহাসের খলনায়ক, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা এবং তারেক রহমানকে নিয়ে কুৎসা রটনা করে একশ্রেণীর গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে, দেশব্যাপী জিয়া পরিবার এবং জাতীয়তাবাদী আদর্শের রাজনীতিকে সর্বসাধারণের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার মধ্যে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে ২০০৭ ১/১১’র প্রেক্ষাপট তৈরী করা হয়। অনিরাপদ হয়ে পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। টার্গেট করা হয় জাতীয়তাবাদী শক্তির রক্ষাকবচ জিয়া, খালেদা ও তারেক রহমানকে। শুরু হয় জিয়া, খালেদা এবং তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। লেখকঃ মোঃ হারুন অর রশিদ মজুমদার/ আহবায়ক, চৌদ্দগ্রাম পৌরসভা বিএনপি, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা।
Leave a Reply