কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে ঘিরে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও কৃষকদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালার সঙ্গে স্থানীয় খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের অসঙ্গতি এবং প্রচারণার ঘাটতিকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে, কালীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও খাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ কৃষকদের জানিয়েছেন, ৩ হাজার কেজি বা ৩ মেট্রিক টনের নিচে ধান সরকারি গুদামে জমা দেওয়া যাবে না। তার এমন বক্তব্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ অধিকাংশ কৃষকের পক্ষে একসঙ্গে ৩ মেট্রিক টন ধান সরবরাহ করা সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মেহেদী হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একজন কৃষক সর্বনিম্ন ১২০ কেজি এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার কেজি ধান সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে সরবরাহ করতে পারবেন। ফলে খাদ্য গুদাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে কৃষি বিভাগের তথ্যের সুস্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে, বিষয়টি নিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) শামীম আরা নীপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে গুদামে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফায়েল সাহেবের সঙ্গে কথা বলুন। আমার বিস্তারিত জানা নেই।”
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, যদি প্রকৃতপক্ষে ৩ হাজার কেজির কম ধান গ্রহণ না করা হয়, তাহলে উপজেলার অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষক সরকারি ক্রয় কার্যক্রমের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। এতে তারা বাধ্য হয়ে বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করতে পারেন, যা তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এদিকে ধান সরবরাহের জন্য ২০ মে ২০২৬ সালের মধ্যে অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করার কথা থাকলেও আদৌ কতজন কৃষক নিবন্ধিত হয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কৃষকদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার কথা থাকলেও ২০ মে দুপুরের পর সীমিত পরিসরে কিছু মাইকিং করা হয়, যা অধিকাংশ কৃষকের কাছে পৌঁছায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুরু থেকেই প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে পাইকারদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের একটি পরিকল্পনা ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাইকার দাবি করেন, প্রতি ৩ মেট্রিক টন ধানের বিপরীতে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন আদায়ের সুযোগ রয়েছে। এ কারণে প্রকৃত কৃষকদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ঈদের ছুটির পর খাদ্য অফিসের এক কর্মচারীর মাধ্যমে বিভিন্ন পাইকারকে ফোন করে দুপুর ১২টার পর অফিসে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য বলা হয়। এ ঘটনাও ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কৃষকদের একাংশের দাবি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্য ও কার্যক্রমে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে রহস্যজনক কারণে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে অনাগ্রহ দেখানো হচ্ছে। তারা এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত তথ্য প্রকাশ এবং সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলকভাবে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় কৃষক ও সচেতন মহল মনে করেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সকল কৃষকের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। এজন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
Leave a Reply