জনভিত্তির সংকট, সাংগঠনিক অনুপস্থিতি ও ভোটযোগ্যতা নিয়ে বাড়ছে প্রশ্ন–
বিশেষ প্রতিনিধি: ঢাকা-১৬ সংসদীয় আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী আব্দুল বাতেনকে কেন্দ্র করে এলাকায় একাধিক গুরুতর অভিযোগ ও প্রশ্ন ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা হলো—এই আসনে প্রার্থী ও দলের প্রকৃত জনভিত্তি আদৌ আছে কি না। স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায় নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ ও গভীর তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
ব্যবসা ও অর্থনৈতিক তৎপরতা
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রার্থী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ে এলাকায় আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য ও চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই ও তদন্ত ছাড়া এসব বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলো সরাসরি নিজের নামে না চালিয়ে স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নামে পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে প্রকৃত মালিকানা ও দায় নির্ধারণ জটিল হয়ে উঠছে বলে তাদের দাবি।
রাজনৈতিক অবস্থান ও দ্বৈত যোগাযোগ নিয়ে সন্দেহ
রাজনৈতিক অঙ্গনেও আব্দুল বাতেনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগের এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও ইখলাস উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। যে মার্কেটে তিনি ফার্মেসি পরিচালনা করেন, সেই মার্কেটের মালিকানা সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার—এ তথ্য নিয়েও আলোচনা চলছে।
সহিংস ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ছায়া আছে কি না—অনুসন্ধানের দাবি
এলাকায় সংঘটিত ককটেল বিস্ফোরণসহ কিছু সহিংস ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক মদদের অভিযোগ শোনা গেলেও এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য।
ভোটার প্রভাবিত করার কৌশল—নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের আশঙ্কা
নির্বাচনী প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার অভিযোগ সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কালাপানি বস্তি, ঝিলপাড় বস্তি, শিয়ালবাড়ী বস্তি ও মিরপুর–১২ মোল্লা বস্তিসহ কয়েকটি এলাকায় রাতের আঁধারে দরিদ্র ভোটারদের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি সংগ্রহ করা হচ্ছে। ভোটের বিনিময়ে জনপ্রতি প্রায় দুই হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ভোট দিতে না চাইলে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও অর্থ দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হচ্ছে।
ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহারের অভিযোগ—আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে, ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। গোপনে এমন বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে যে, নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে গুনাহ মাফ হবে কিংবা জান্নাত নিশ্চিত হবে। রূপনগর–দুয়ারীপাড়া এলাকায় একজন স্থানীয় নেতা মসজিদ ও মাদ্রাসাকেন্দ্রিকভাবে এ ধরনের প্রচারণায় যুক্ত—এমন দাবিও করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
সাধারণ মানুষের বক্তব্য
এলাকাবাসীর অনেকেই অভিযোগের পাশাপাশি ক্ষোভের কথাও প্রকাশ করেছেন। একাধিক বাসিন্দা বলেন, “বাতেনকে আমরা কোনো দিন এলাকায় দেখিনি। আপদে–বিপদে তিনি আসেন না। তাহলে আমরা তাকে কেন ভোট দেবো?”
আরেকজন বাসিন্দার ভাষ্য, “জামায়াত করলে কী হবে—জামায়াতের কোনো লোকজ আমির আমরা চিনি না। হুট করে দল বেঁধে আসে, আবার চলে যায়। সাধারণ মানুষের খোঁজ কেউ রাখে না।”
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যেসব রাজনৈতিক নেতা এলাকায় নিয়মিত থাকেন, মানুষের সুখ–দুঃখে পাশে দাঁড়ান—ভোটের সময় তারাই মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে ওঠেন। হঠাৎ করে নির্বাচনের সময় এলাকায় উপস্থিত হওয়াকে অনেকেই লোক দেখানো তৎপরতা হিসেবে দেখছেন।
রাজনৈতিক উপস্থিতি ও সাংগঠনিক প্রশ্ন
ঢাকা–১৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ ভোটাররা। অনেকেরই প্রশ্ন—এই আসনে জামায়াতের প্রকৃত অস্তিত্ব কোথায় এবং কোন জনভিত্তির ওপর তারা ভোট প্রত্যাশা করছে?
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, “এলাকায় নিয়মিত কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম চোখে পড়ে না। জনগণের সুখ–দুঃখে পাশে থাকার নজিরও খুব কম। তাহলে মানুষ কেন তাদের ভোট দেবে?”
ভোটারদের মতে, নির্বাচনের আগে হঠাৎ উপস্থিতি কিংবা দলবদ্ধভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ের তৎপরতা দীর্ঘদিনের আস্থার বিকল্প হতে পারে না। ফলে জামায়াতের প্রার্থী ও দলীয় কাঠামো কতটা জনগণের সঙ্গে সংযুক্ত—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সাংবাদিকদের মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানের আহ্বান
ভাই–মিল্লাত ক্যাম্প, কালাপানি বস্তি, রূপনগর থানার সামনে ঝিলপাড় বস্তি, টি–ব্লক বস্তি, শিয়ালবাড়ী বস্তি, মিরপুর–১২ মোল্লা বস্তি, টেকের বাড়ি বস্তি ও উত্তর কালশী হিন্দুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় গোপন নির্বাচনী তৎপরতা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়রা মনে করছেন, সাংবাদিকদের সরেজমিনে গিয়ে সাধারণ মানুষের বক্তব্য নেওয়া প্রয়োজন। প্রতিটি এলাকায় দু–একজন স্থানীয় প্রতিনিধি সহযোগিতা করলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানা সম্ভব হবে—ভোটের বিনিময়ে কী ধরনের আশ্বাস বা অর্থ দেওয়া হচ্ছে।
কেন জরুরি নিরপেক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্ত
সামগ্রিকভাবে ঢাকা–১৬ আসনের পরিস্থিতি একাধিক গুরুতর প্রশ্ন সামনে আনছে—প্রার্থী কি সত্যিই জনগণের প্রতিনিধি হওয়ার মতো সামাজিক ও রাজনৈতিক সংযোগ তৈরি করতে পেরেছেন? নাকি নির্বাচনী সময়কে কেন্দ্র করে সীমিত ও সংগঠিত তৎপরতার মাধ্যমেই আস্থা আদায়ের চেষ্টা চলছে?
সচেতন মহলের মতে, এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হলে নির্বাচন নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
উপরোক্ত সব অভিযোগ স্থানীয়দের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। লেখক: রাজু আহমেদ।
Leave a Reply