ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হারিয়ে যাওয়া ২০ লাখ টাকা কুড়িয়ে পেয়ে প্রকৃত মালিকের হাতে ফিরিয়ে দিয়ে সততার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন নাজিরহাট পৌরসভার নৈশপ্রহরী নুরুল আলম বাচা।
তাঁর এই ব্যতিক্রমী মানবিক ও নৈতিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে উপজেলা প্রশাসন ও নাজিরহাট পৌরসভা তাকে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
শুক্রবার বিষয়টি নিশ্চিত করে ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, বর্তমান সমাজে অর্থের লোভে মানুষ যখন নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, তখন একজন সাধারণ নৈশপ্রহরীর এমন সততা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। তাঁর এই কাজ শুধু একজন ব্যবসায়ীর অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনা নয়, বরং সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের একটি শক্তিশালী বার্তা।

তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নুরুল আলম বাচাকে ‘সততার সম্মাননা’ দেওয়া হবে। পাশাপাশি নাজিরহাট পৌরসভাও তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে।
জানা যায়, গত বুধবার গভীর রাতে নাজিরহাট পৌর এলাকায় দায়িত্ব পালনকালে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা একটি ব্যাগ দেখতে পান বাচা। ব্যাগটি খুলে তিনি বিপুল পরিমাণ টাকা দেখতে পান। পরে বিভিন্ন সূত্রে খোঁজখবর নিয়ে তিনি টাকার প্রকৃত মালিক স্থানীয় ব্যবসায়ী দুর্লভ ধর-এর সন্ধান পান এবং রাতেই তার হাতে পুরো অর্থ তুলে দেন।
টাকা ফেরত পাওয়ার পর ব্যবসায়ী দুর্লভ ধর বাচার সততা ও দায়িত্ববোধের প্রশংসা করে বলেন, “এমন মানুষ সমাজে খুব বেশি নেই। তিনি চাইলে টাকাগুলো নিজের কাছে রাখতে পারতেন, কিন্তু তা না করে সততার পরিচয় দিয়েছেন। আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।”
ঘটনাটি পরদিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়ে। ফটিকছড়িসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তাঁর প্রশংসা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও বাচা যে সততার পরিচয় দিয়েছেন, তা বর্তমান সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাঁর মাসিক আয় সীমিত হলেও তিনি কখনো অসৎ পথে হাঁটেননি।
নুরুল আলম বাচা নাজিরহাট পৌরসভার বাবুনগর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত কবির আহাম্মদের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এবং একমাত্র ছেলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
স্থানীয় সাংবাদিক সালাহউদ্দিন জিকু বলেন, “এত বড় অঙ্কের টাকা পেয়ে অনেকেই হয়তো লোভ সামলাতে পারতেন না। কিন্তু বাচা প্রমাণ করেছেন, সততা এখনো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
আরেক সাংবাদিক প্রদীপ চৌধুরী বলেন, “দুর্নীতি ও অনৈতিকতার নানা ঘটনার মধ্যে নুরুল আলম বাচার মতো মানুষ সমাজকে আশাবাদী করে। তাঁর মতো মানুষদের সম্মানিত করা হলে সমাজে ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়বে।”
নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে নুরুল আলম বাচা বলেন, “টাকাগুলো আমার ছিল না। তাই প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া আমার দায়িত্ব মনে করেছি। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
স্থানীয়দের মতে, নুরুল আলম বাচার এই সততা শুধু একটি হারানো টাকা ফেরত দেওয়ার ঘটনা নয়, এটি সমাজে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকবে।
Leave a Reply