ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল এলাকায় পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে দুই ভাইয়ের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ঘটনায় বড় ভাই মো:আজিজের বিরুদ্ধে ছোট ভাই মো:হাসানকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং ভূজপুর থানার ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৬ মে নাজিরহাট পৌরসভার সুয়াবিল এলাকার চুরখাঁ বাজারসংলগ্ন আবুল খায়ের সওদাগরের বাড়িতে পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে মৃত আবদুস সালামের দুই ছেলে মো: আজিজ ও মো: হাসানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পর মো:আজিজ ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের রোগী নিবন্ধন বইয়েও তার চিকিৎসা গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে।
পরবর্তীতে একই দিনে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করেন। তবে হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গুরুতর শারীরিক আঘাতের প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে ভর্তি না করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এরপর মো: আজিজ নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে মাথায় সেলাই করিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার দাবি তুলে মামলা দায়ের করেন।
এদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মামলার সঙ্গে উপস্থাপিত একটি সিটি স্ক্যান রিপোর্ট প্রকৃতপক্ষে অন্য একজনের বহু পুরোনো রিপোর্ট, যা মো: আজিজের নামে ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেন হাসানের পরিবার।
এদিকে প্রতিবেদনে মাথার খুলি (স্কাল) ফেটে যাওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও আজিজের মাথার সেলাইয়ের স্থান এবং রিপোর্টে বর্ণিত আঘাতের স্থান ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছে।
বিষয়টি পর্যালোচনা করে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এটিকে গুরুতর অসঙ্গতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গোপন সূত্রে আরও জানা যায়, গুরুতর আহত হয়ে আইসিইউতে ভর্তি থাকার দাবি করা হলেও মাত্র চার দিনের মধ্যেই মো:আজিজকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে দেখা যায়। এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে সুস্থ ব্যক্তির মতো কথা বলার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিষয়টি নিয়ে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের রেজিস্টারে সংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়, ২৬ মে আজিজের অবস্থা গুরুতর ছিল না। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র থেকেও।
অন্যদিকে, মাথায় ৪২টি সেলাই এবং আইসিইউতে ভর্তি থাকার দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, কেউ তাদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে এমন কাজ করে থাকতে পারে। তারা আরও বলেন, আজিজের উপস্থাপিত প্রতিবেদনে হাসপাতালের কোনো অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রামের এক বিশিষ্ট সার্জন সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানান, প্রতিবেদনে বর্ণিত মাথার খুলির আঘাতের মাত্রা সত্য হলে রোগীকে সাধারণত কমপক্ষে তিন মাস বা তারও বেশি সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হতে পারে।
এছাড়া ক্ষতস্থান পর্যবেক্ষণ করে তার কাছে মনে হয়েছে, আঘাতটি স্বাভাবিকভাবে সৃষ্ট না হয়ে ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে মাথার উপরের ত্বক কেটে পরবর্তীতে সেলাই দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে ভূজপুর থানার ওসি বিপুল চন্দ্র দে বলেন, আজিজ গুরুতর আহত হওয়ার দাবি করে ঘটনার কয়েকদিন পর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তবে গুরুতর আহত ও আইসিইউতে ভর্তি থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যে নিজে থানায় এসে মামলা করলেন—এ প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, “যেকোনো ব্যক্তি মামলা করতে পারেন, তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।”
ভূজপুর থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জ্যোতিষ চন্দ্র দেবের কাছে আজিজের চিকিৎসা প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি মূলত দুই ভাই ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধের ফল। বিষয়টি সামাজিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা করা হবে বলেও তিনি জানান।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার বাদী মো. আজিজের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা হোক এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।
Leave a Reply