শাহজাহান আলী মনন/ সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি: নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে আন্ত:জেলাসহ বিভিন্ন রুটে ফিটনেসবিহীন, লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস-মিনিবাস ওয়ার্কসপে রং করে চালানো হচ্ছে সড়কে। এসব লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাসের কারণে যাত্রীদের ভোগান্তির সাথে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে যাত্রীচাপ সামলাতে সেগুলো ঢাকাসহ বিভিন্ন দুরপাল্লার রুটেও চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ উপজেলা থেকে বিভিন্ন রুটে ৪ শতাধিক বাস বাস, মিনিবাস ও কোচ চলাচল করে। এর মধ্যে ফিটনেস হালনাগাদ রয়েছে এমন রেজিষ্টেশনকৃত বাস, মিনিবাস ও কোচের সংখ্যা ২১৭ টি । আর দেড় শতাধিক বাস, মিনিবাস ও কোচের নেই ফিটনেস সনদ। গত এক বছরে ১৯৫ টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে অধিকাংশই ঘটেছে লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা বাস-মিনিবাস কারণে।
এদিকে যাত্রীদের অভিযোগ সড়কে এসব বাস দীর্ঘদিন ধরে চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরব। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারছেন না তারা।
বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এর নীলফামারী অফিস সূত্রে জানা যায়, ভৌগলিক কারণে নীলফামারীর সৈয়দপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা। স্থানীয় বাস টার্মিনাল হতে আন্তঃজেলাসহ রংপুর, দিনাজপুর ও দিনাজপুরের পার্বতীপুর, ফুলবাড়ি, পঞ্চগড় এবং ঢাকা রুটে চার শতাধিক বাস চলাচল করে।
এসবের মধ্যে ২১৭ টি বাস ও মিনিবাসের ফিটনেস ও রুট পারমিটের হালনাগাদ সনদ রয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী বিআরটিএ’র অধীন চারটি বাস, ২৩ টি মিনিবাস এবং মালিক সমিতির অধীনে ১০৪ বাস ও ৮৬ টি মিনিবাস রেজিষ্ট্রেশনকৃত।
বাকি দেড় শাতাধিক বাস-মিনিবাস শর্ত পূরণ করে পরিদর্শন সাপেক্ষে এখনো ফিটনেস বা রুট পারমিট সনদ গ্রহণ করেনি। ফিটনেস ও রুটপারমিট হালনাগাদ করা এই যানবাহনগুলোর বাইরেও বেশ কিছু যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন সম্পর্কিত জটিলতা রয়েছে। সেগুলোও সড়কে চলছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে সৈয়দপুর ও তারাগঞ্জ এলাকায় রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কে ১৯৫ টি দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় ১৪৬ জন।
গতকাল শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সৈয়দপুর বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ফিটনেসহীন এসব গাড়ীর কোনোটির সিট ছেঁড়া, চেচিস ভাঙ্গা। আবার কোনোটির বডিতে রং নেই। বহু পুরনো এসব গাড়ি মেরামত করে নতুন সাজে রোডে নামানো হয়েছে।
ফিটনেসবিহীন ভাঙাচোরা গাড়িগুলো জোড়াতালি ও রং দেয়া হচ্ছে বাসটার্মিনাল সংলগ্ন ওয়ার্কশপগুলোতে। ওয়ার্কশপে ফিটনেসবিহীন বাস রং করছেন কারিগররা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ওয়ার্কসপের কারিগর বলেন, পুরনো এসব গাড়ি যতই ঠিক করা হোক রাস্তায় নামানোর পর থেকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়। তবে একথা মানতে রাজি না বাস মালিকরা।
তারা বলছেন, রোডে বাস চললে ছোটখাট ত্রুটি হতেই পারে। আমাদের একটি ইঞ্জিন ও চেসিসের মেয়াদ ন্যূনতম ২০ বছর। এর আগে তেমন কিছু হয় না। তাদের দাবি রোডে যে দুর্ঘটনাগুলো হয় সাধারণত অসচেতনতার কারণে ও ড্রাইভারদের অসম প্রতিযোগিতার কারণে।
সৈয়দপুর শহরের রসুলপুর এলাকার বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম নামের এক যাত্রী বলেন, আমি দিনাজপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। সৈয়দপুর থেকে প্রতিদিন বাসে করে দিনাজপুরে যাই। কিন্তু অধিকাংশ বাসই লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা। অনেটা বাধ্য হয়ে যেতে হয়। প্রতিদিন আমার মতো হাজার হাজার যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসব বাসে এখান থেকে বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে।
নীলফামারী জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি ও সৈয়দপুর রাজনৈতিক জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যক্ষ আব্দুল গফুর সরকার বলেন, আমরা মালিক সমিতি থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে গাড়ির মালিকদের সাফ জানিয়ে দিয়েছি যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া তারা যেন তাদের যানবাহন রাস্তায় না নামায়। ফিটনেসবিহীন গাড়ী যেন কোনোভাবেই সড়কে না নামানো হয়। যারা নামাবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ তারাও যেন ওই মালিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এর নীলফামারীর সহকারী পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, আসন্ন ঈদ উপলক্ষে ইতিমধ্যে জেলার সব বাস-মিনিবাস মালিকদের নিয়ে একটি সভা করেছি। তাদেরকে ফিটনেসবিহীন গাড়ী সড়কে না চালানোর জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তবে জেলার পরিবহন সেক্টরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সেবিহীন চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধ করতে অভিযান জোরদার করার কথা জানান তিনি।
Leave a Reply