আজগর আলী: কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে মব সৃষ্টি করে কারখানার মালামাল ও যন্ত্রপাতি লুটের অভিযোগ করেছেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ী। ২৬ শে এপ্রিল রবিবার রাতে সাত জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১৫/২০ জনকে বিবাদী করে চৌদ্দগ্রাম থানায় পৌনে দুই কোটি টাকার মালামাল ও যন্ত্রপাতি লুটের অভিযোগ দায়ের করেন ওই ব্যবসায়ী। তথ্যটি নিশ্চিত করেন চৌদ্দগ্রাম থানার উপ-পরিদর্শক সৈয়দ সানাউল্লাহ। পুলিশ বাদীর অভিযোগের ঘটনার বিষয়ে সঠিক তদন্ত না করে এবং লুট হওয়া মালামাল সম্পর্কে তেমন কোন ভূমিকা না নিলেও- সংবাদকর্মীদের ভূমিকা বাদীর লিখিত অভিযোগের সত্য ঘটনা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। লিখিত অভিযোগ পেয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার আপন দায়িত্বকে ভূলে গিয়ে, রহস্য জনক কারনে চৌদ্দগ্রাম থানার পুলিশ উল্টো পথে হাটছে। সঠিক তথ্য উদঘাটনের জন্য আমাদের এ প্রতিবেদক অনুসন্ধান বেরিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে প্রতিবেদকের হাতে এসে পৌছায় ফয়েজের নেছা সুমি বকেয়া ভাড়ার নামে মিথ্যা গল্প সাজিয়ে মিজান অয়েল মিল বেদখলের আসল রহস্য। আমরা ইতিমধ্যে সুমির হাতের লেখা একটি হিসেবের খাতার একটি পাতা সংগ্রহ করি। সেখানে দেখা যায়, ফয়েজের নেছা সুমি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মিজান অয়েল মিলের সাথে ভাড়া লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। অপর পৃষ্টার তথ্য এখনো আমাদের হাতে এসে পৌছায়নি।
এদিকে, গত ৪ এপ্রিল সোমবার এক পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে আসছে চৌদ্দগ্রাম বিসিক শিল্পনগরীর লুট হওয়া মালামালের সন্ধান। বকেয়া ভাড়ার কথা বানোয়াট বলে অস্বীকার করেছে ফয়েজের নেছা সুমি। তবে মিজান অয়েল মিলের কাছে ২০২৪ সালের কিছু বকেয়া টাকা তিনি পাবে বলে স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি মিজান অয়েল মিলের সমস্ত মালামাল ফয়েজের নেছা সুমির হেফাজতে আছে বলে সূত্র জানিয়েছেন। বাদীর দায়েরকৃত অভিযোগের সত্যতা প্রাথমিক পর্যায়ে প্রমান হলেও এবিষয়ে পুলিশের কোন ভূঁমিকা আজও দেখা যায়নি। পুলিশের কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। কোনো অপরাধের শিকার হয়ে দায়ের করা অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত, এবং কোনো প্রকার ঘুষ বা হয়রানি ছাড়া আইনি সহায়তা পাওয়া মানুষের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার রয়েছে। অথচ বছরের পর বছর সরকারকে রাজস্ব আয়কর প্রদান করে, একটি শিল্পকারখানার মালিক প্রতিনিয়ত ন্যায় থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। দেখার যেন কেউ নেই।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়নের বিষবাগ গ্রামের মৃত আবদুল মান্নানের ছেলে মিজানুর রহমান ২০১৪ সালের মে মাসে চৌদ্দগ্রাম বিসিকে ৫ লক্ষ টাকা জামানত ও ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া চুক্তিতে জনৈক আবদুল মান্নানের দুটি প্লটে (প্লট নং বি-৬, বি-৭) তেল কারখানা স্থাপন করেন। ৩০ শে মে ২০২৪ইং তারিখে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। তবে ১০ বছর মেয়াদ শেষে পুনরায় ভাড়া চুক্তি নবায়নের শর্ত ছিল। ২০১৮ সালে ২ কোটি টাকা ব্যাংক লোন নিয়ে ভাড়া চুক্তি নবায়ন ও ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধি করে মিজান অয়েল মিল প্রতিষ্ঠা করে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করে আসছিলেন। এর মাঝে ২০২৩ সালে প্লটের মালিক আবদুল মান্নানের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগ মূহুর্ত পর্যন্ত ভাড়াটিয়া মিজান অয়েল মিলের সাথে আবদুল মান্নান নিজেই লেনদেন করে আসছে। এদিকে, আবদুল মান্নানের স্ত্রী ফয়জুন্নেসা সুমী নতুন করে আবার ভাড়া চুক্তি নবায়নের কথা বলে। স্বামীর মৃত্যুর কিছু দিন পরেই সুমী তার প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারী সাথে বিয়ে করে নেয়। অন্যদিকে, আবদুল মান্নানের মা আনোয়ারা বেগমের সাথে চুক্তিপত্র নবায়ন করেন মিজানুর রহমান। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ম্যানেজারকে দায়িত্ব দিয়ে আরব আমিরাত চলে যান মিজান। এরপর দুই দফায় ফয়জুন্নেসা সুমী প্রভাবশালী লোকজন নিয়ে কারখানায় হামলা করে মালামাল লুট করে নিয়ে যায় বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন ওই ব্যবসায়ী।
সরেজমিনে গিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়ে জানা যায়, যেসব অপরাধী তাদের ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত উপাধি পায়। তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ভয়ঙ্কর অপরাধী কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের এই ফয়েজের নেছা সুমি। চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মুন্সীরহাট ইউনিয়ন বাহেরগড়া মৃত আবদুল মান্নানের স্ত্রী এবং পৌরসভার শ্রীপুর গ্রামের আবুল কাশেমের মেয়ে ফয়েজের নেছা সুমি। সে পরিকল্পিত একজন ক্রিমিনাল প্রকৃতির অপরাধী। স্বামীর মৃত্যুর পর বেরিয়ে আসে অন্তরালে থাকা এই নারীর আসল কাহিনী। মুখের মায়াবী ভাষা আর ভদ্রতার স্টাইলে বুঝা যায় সে একজন অবুঝ সন্তান। আসলে তা নয়। তার ভিতরে মিথ্যা কথা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে বলার মতো আরেকটি মেশিন আছে বলে অনেকে ধারনা করেন।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, চৌদ্দগ্রাম থানায় জিডি করে পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গোপনে ম্যানেজ করে, চার লক্ষ টাকার বিনিময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন সন্ত্রাসীকে ভাড়া করে, পরিকল্পিতভাবে মিজান ওয়েল বেদখল করেছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, বিসিক শিল্পনগরীতে মান্নানের বরাদ্দকৃত জায়গায় অবস্থিত আল মদিনা এ্যালমিনিয়াম মল্ডিং নামক নিজ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন কর্মচারীর সাথে মান্নানের স্ত্রী ফয়েজের নেছা সুমীর অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক ছিল। হঠাৎ একদিন মান্নান কর্মচারীর সাথে তার স্ত্রী সুমিকে উলঙ্গ অবস্থায় ধরে ফেলে। তাৎক্ষণিক মান্নান তার স্ত্রীকে মারধর করে এবং সংসার থেকে তাকে বিচ্ছেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এ ঘটনায় বিষয়ে শালিস বৈঠকে সুমি তার অপাধের জন্য আব্দুল মান্নানের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা চাইলে- মান্নান তার তিন সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সুমীকে ক্ষমা করে দিয়ে পুনরায় ঘর সংসার শুরু করে। এ ঘটনার কয়েকদিন পরেই মান্নানের চোখে সামান্য চুলকানির সমস্যা দেখা দেয়। এই দূর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরকীয়া প্রেমিকসহ শলা পরামর্শ করে মান্নানকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে। ডাক্তারের কাছে না নিয়ে ফয়েজের নেছা সুমী তার স্বামী আব্দুল মান্নানের চোখে বিষাক্ত ড্রপ ব্যবহার করিয়ে চোখ দুটি নষ্ট করে দেয়। পরে মান্নানের আপন ভাই মন্তাজ উদ্দিন অসুস্থ মান্নানকে ঢাকায় চক্ষু হসপিটালে নিয়ে চিকিৎসা করায়।
ফয়েজের নেছা সুমী তখন থেকেই মান্নানের সমস্ত অর্থ সম্পদ পরিকল্পিতভাবে নিজের নামে নেয়ার জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্র শুরু করে। এক পর্যায়ে মান্নানকে সোনার হরিণ ধরার লোভনীয় স্বপ্ন দেখিয়ে জমি বিক্রি করা শুরু করে। ফয়েজের নেছা সুমীর পরিকল্পিত মায়াবী কথা শুনে ভিটেমাটি বিক্রি করা শুরু করে তার স্বামী মান্নান। একপর্যায়ে নিজ এলাকায় ও আশপাশের জায়গা সম্পত্তি অসৎ উদ্দেশ্যে সুমি কৌশলে বিক্রি করিয়ে আবদুল মান্নানকে নিয়ে নতুন নতুন স্বপ্ন দেখিয়ে বাপের বাড়ী পৌরসভার শ্রীপুর গ্রামে নিয়ে আসে। ধীরে ধীরে কব্জা করতে থাকে নগদ টাকা এবং সম্পদ। আস্তে আস্তে মান্নানকে তার স্ত্রী সুমী জন্মস্থান এবং মা ভাই বোনদের থেকে আলাদা করে রাখে। সুমীকে অন্তরালে তার আপন বোন জামাই তিনপাড়া গ্রামের বদিউল আলমের ছেলে আবু বকর অর্থাৎ বিসিক শিল্পনগরীতে কর্মরত জাফর আহমেদের আপন ভাই এবং পরকীয়া প্রেমিকসহ মান্নানকে ঘায়েল করার মহা পরিকল্পনা শুরু করে। এক মাসের মাথায় আবদুল মান্নান সুমীর বাপের বাড়ীতে অসহায় হয়ে পড়ে। সুমীর লাথি উস্টা আর অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং মরন যন্ত্রণা সহ্য করতে না ফেরে অবশেষে আবার মায়ের বুকে ফিরে আসে আবদুল মান্নান। অন্যদিকে সুমী পরকীয়া প্রেমিক নিয়ে রঙ তামাশায় অতি আনন্দে দিন অতিবাহিত করে আসছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, অসুস্থ আবদুল মান্নানকে তার স্ত্রী সুমী বাপের বাড়ী থেকে বের করে দেয়ার পর, নিজের জন্মস্থান বাহেরগড়া মা এবং ভাইদের কাছে আশ্রয় নেয়। এখান থেকেই মান্নান তার সন্তানদেরকে শেষবারের মতো একবার দেখার জন্য স্ত্রী সুমীর কাছে মোবাইল ফোনে আকুতি মিনতি করেও কোন লাভ হয়নি। অবশেষে স্ত্রী সন্তানদের দেখার শেষ ইচ্ছাটুকু পূরন করতে দেয়নি ভয়ংকর নারী ফয়েজের নেছা সুমী।
এদিকে, প্রতিষ্ঠানের মালিক মিজানুর রহমানের অনুউপস্থিতিতে যখন ফয়জের নেছা সুমি সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে শ্রমিকদের উপর এলোপাথাড়ি মারধর করে, আতঙ্কগ্রস্ত মহিলা শ্রমিকরা তাৎক্ষণাৎ নিজের ইজ্জত এবং অত্যাচারের ভয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সন্ত্রাসীদের আতঙ্ক এবং ভয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও একমাসের বেতনের সাথে ঈদের বোনাস পাওয়ার আশা যেন এক নিমিষে শেষ হয়ে গেলো। মিজান অয়েল মিলে কর্মরত সকল কর্মচারীর চোখের পানি এবং অজস্র কান্নার ঢল বিসিক এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
সূত্র জানায়, মান্নানের মৃত্যুর পর সুমী বিয়ের পূর্বে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত থাকা প্রেমিককে বিয়ে করেন। বকেয়া ভাড়া পরিশোধের মিথ্যা অজুহাত রটিয়ে ফয়েজের নেছা সুমী মিজান অয়েল মিলে জোর পূর্বক বেদখল করার জন্য এবং প্রতিমাসে নিয়মিত ভাড়া আদায় করে নিয়ে আসা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র নিজের কব্জায় আনার মহা-পরিকল্পনায়, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভাড়া বকেয়ার অভিযোগ তুলে ধরেন। চৌদ্দগ্রামের অনেক প্রভাবশালী নেতার সহযোগিতা চেয়ে, অবশেষে তিনি দেহ মন বিলিয়ে দিয়ে এবং নগদ ৪ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, অন্যায়ভাবে রাতের অন্ধকারে উক্ত মিজান অয়েল মিলটি বেদখলের পরিকল্পনা। এরেই মধ্যে সন্ত্রাসী বাহিনীর গর্ডফাদার এ ঘটনার পূর্বে থানায় একটি জিডি করে, ঠান্ডা মাথায় বেদখল করার পরামর্শ দেয়। সিরিয়াস ক্রাইমকে হার মানিয়ে মিজান অয়েল মিলটি, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে ব্যবহার করিয়ে সুমি বেদখল করে নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীর আসল চেহারা বেরিয়ে আসতে শুরু করবে। কিন্তু রহস্যজনক কারনে পুলিশ ওই পথে হাটছেনা বলে জানা গেছে।
Leave a Reply