মীর হোসেন মোল্লা: রাজনীতি একটি বহুমুখী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ রাজ্য বা রাষ্ট্রপরিচালনার কৌশল। গ্রিক শব্দ ‘পলিটিকোস’ থেকে ইংরেজিতে ‘পলিটিক্স’। বাংলায় যাকে আমরা রাজনীতি বলে থাকি। এর অর্থ হলো প্রজাদের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার নিয়ম-নীতি, যা ঐক্যমতের ভিত্তিতে দেশনায়ক রাজনীতিবিদগণ গ্রহণ করে থাকেন। আর এর সহজ এবং ছোট্ট অর্থ হলো, সমাজসেবা। এটা বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ও কার্যকর পন্থা হচ্ছে একটি সংগঠন। অর্থাৎ রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে ঐ সেবাটা নিশ্চিত করা অধিকতর সহজ। রাষ্ট্রের মূলনীতি অনুযায়ী রাজনীতি মূলত নগর ও সমাজ পরিচালনার এক অহিংস পদ্ধতি। একাডেমিক ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হয়। সরকারবিষয়ক বিজ্ঞান হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হতে পারে। রাজা, রাষ্ট্র ও সরকারবিষয়ক কর্মকান্ডের সাথে এটি জড়িত। রাজনীতির একাডেমিক অধ্যয়নকে বিজ্ঞানও বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে বাংলাদেশে এটি নেগেটিভ অর্থেও ব্যবহৃত হয়।
রাজনীতি একটি মহৎ কাজ। আবেগ এখানে মূল্যহীন। প্রাচীন গ্রিসে রাজনীতি বলতে নগররাষ্ট্র ও তার শাসন ব্যবস্থার বস্তুগত ও দর্শনগত অধ্যয়নকে বোঝাত। সাধারণ অর্থে রাজনীতি বলতে সেসব নীতিমালাকে বলা হয়, যা অনুসরণের মাধ্যমে একটি জাতি বা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, যাকে বলা হয় দেশের মূল চালিকাশক্তি, যার মাধ্যমে দেশকে নির্মাণ করা যায়। দেশের মানুষের সার্বিক নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা যায়। সংকীর্ণ অর্থে, রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাদখলের লড়াই এবং কৌশলকে রাজনীতি বলে, যার মধ্যে ন্যায়নীতিবিবর্জিত লড়াইও অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে ন্যায়নীতিবিবর্জিত উপায়ে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা লাভকেও মানুষ রাজনীতি মনে করে থাকেন। এটা এখন আর ব্যক্তিগত কিংবা দলীয় লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার, গ্রাম ও সমাজে এটা প্রবেশ করেছে। বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে রাজনীতির মহড়া। আইন-আদালত, অফিস ও ব্যাংক-বীমাও জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে। খেলার মাঠ, সমিতি ও সংঘের ভিতরেও বিস্তার লাভ করেছে এটা। জালের মতো এটা ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-শহরের অলি-গলিতে।
অ্যারিস্টোটলের মতে, রাজনীতি হলো নগর-রাষ্ট্র পরিচালনা ও নাগরিক সম্পর্কিত জ্ঞান বা শৃঙ্খলা। সুতরাং একটি দেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন বিভাগ ইত্যাদির মধ্যে একাডেমিক ও প্রায়োগিক রাজনীতি বিদ্যমান রয়েছে। তার মতে, রাষ্ট্রের সাথে রাজনীতি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সুতরাং যেদিন থেকে রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছে সেদিন থেকেই রাজনীতির উৎপত্তি হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, রাজনীতি হলো সমাজের বৈধ শৃংখলারক্ষাকারী কিংবা পরিবর্তন আনায়নকারী ব্যবস্থা।
রাজনীতির উল্লেখিত সংজ্ঞা পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, রাজনীতি অতি পবিত্র এক শব্দ। যা মানুষের সার্বিক জীবন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন। রাজনীতি ছাড়া কোনো দেশ, সমাজ ও সংঘ পরিচালিত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমানে এটি একটি নেগেটিভ অর্থবোধক শব্দে রূপান্তর লাভ করেছে। বিশ্বমোড়লদের ক্ষমতা দখলের অনৈতিক বাসনা এটিকে দূষিত করেছে। জবরদখল, দেশদখল ও নীতিহীনতা রাজনীতিকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। দাঙ্গাবাজি আর ধান্দাবাজির কারণে রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে তাই এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে আলাপচারিতায় একে অপরকে প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ‘আমার সাথে রাজনীতি করিস না’, ‘আমি রাজনীতি পছন্দ করি না’ ইত্যাদি। রাজনীতিবিদদের অনৈতিক চতুরতা রাজনীতিকে নিন্দিত করেছে। রাজনীতিকদের কুরুচিপূর্ণ ভাষাও এটিকে মন্দ নীতিতে চিত্রিত করেছে। কিছু কিছু রাজনীতিবিদের শব্দচয়ন তাদের মনুষ্যত্ব ও রুচিবোধকে নেতিবাচক অর্থে প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে নব্বইয়ের পরে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রায় ১৮ বছর সম্পূর্ণ অসুস্থ রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। ক্রমান্বয়ে এটা লুটপাটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৬ সালে বর্তমান সরকার এসে কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসে দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে, পরিবর্তনে এসেছে নেতাকর্মীদের। বর্তমান পরিস্থিতিকে পছন্দ দেশের জনগণ সাধুবাদ জানিয়েছে। সবমিলিয়ে এ দেশের জনগণ সরকারের সফলতা কামনা করছে। লেখক: মীর হোসেন মোল্লা/সাংবাদিক।
Leave a Reply