মোহাম্মদ শামীমঃ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের জমজমাট ব্যবসা চলছে। দিনের বেলায় চাঁদাবাজি, রাতের বেলায় মাদকের বেচাকেনা চলে ভোর পর্যন্ত। কিছু এলাকার বেশিরভাগ রাস্তাঘাট সরু। কোন কোন জায়গায় হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বেশিরভাগ এলাকায়। এর ওপর রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। এমন কোন অপরাধ নাই যা ঘটে না।
রোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাদকসেবী এবং মাদক ব্যবসায়ীরা কেরানীগঞ্জের জেলেপাড়া ও টিলাপাড়া এলাকার এসে জড়ো হন। টিনশেডের বাড়িতে মাদক সেবনের আড্ডা বসে। অন্য বাড়ি থেকে মাদক বিক্রি করা হয়। অনেক দূরের এলাকা থেকেও মোটরসাইকেলে করে মাদকসেবীরা এখানে মাদক কিনতে আসেন। সেবন করেন অন্যত্র। মাঝেমধ্যে পুলিশ টহল দিতে আসে বটে, তবে আশপাশে মাদক বিক্রেতাদের লোক থাকেন। পুলিশ দেখলেই তাঁরা মুঠোফোনে বিক্রেতাদের সাবধান করে দেন। সবাই কিছুক্ষণের জন্য গা ঢাকা দেন। পুলিশ চলে গেলে অবস্থা আবার আগের মতোই।
স্থানীয় বেয়ারা এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জানান, এখানে যাঁরা মাদক কিনতে বা সেবন করতে আসেন, তাঁদের হাতে একটি বোতল থাকে। পানির বোতল একটা সংকেত। এতে মাদক ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন পানির বোতল হাতে থাকা ব্যক্তি তাঁদের ক্রেতা। এই কৌশল অবলম্বন করে এখানে মাদকের রমরমা ব্যবসা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জেলেপাড়া, টিলাপাড়া, বেয়ারা, ইকুরিয়া—এসব এলাকার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন জরিপ হোসেন ওরফে কালা জরিপ। তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী রয়েছে। জরিপ ও তাঁর সহযোগীরা ক্ষমতাসীন দলের ছত্রচ্ছায়ায় দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ নানা রকম অপরাধমূলক কাজে জড়িত। বিষয়টি সবাই জানেন কিন্তু ভয়ে কেউ কিছু বলেন না। জরিপের বিরুদ্ধে হত্যা, নারী নির্যাতন, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। কিন্তু কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে আবার আগের মতোই মাদক ব্যবসার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত অর্ধশত জায়গায় দেদার মাদক কেনাবেচা চলছে। অনেক স্পটে মাদক সেবনেরও ব্যবস্থা রয়েছে। একেক এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা ক্রেতা ও সেবীদের জন্য একেক রকমের সংকেত ব্যবহার করে থাকেন।
কোথাও হাতে পানির বোতল বা বিশেষ কোনো বস্তু রাখা, মাথা বা কাঁধ চুলকানো এমন সব সংকেত রয়েছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে এসব এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের ভেতরে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটে।
গত ৫ জুলাই মাদক বিক্রির টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ীদের দুই পক্ষের মধ্যে কেরানীগঞ্জ মডেল থানা এলাকার খোলামোড়া আদর্শ স্কুল এলাকায় সংঘর্ষ হয়। মো. নাদিম নামের একজনকে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে মডেল থানায় মামলা হয়েছে।
এদিকে, কেরানীগঞ্জ দক্ষিণ থানার হাসনাবাদ এলাকায় নতুন গড়ে ওঠা আবাসনের নির্মাণাধীন ভবনগুলো এখন মাদক কেনাবেচার বড় কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। সরেজমিনে দেখা গেলে, বসুন্ধরা রিভারভিউ প্রকল্পের শেষ প্রান্ত এবং হাসনাবাদ হাউজিং প্রকল্পের শেষ প্রান্তের মাঝখানে মাঠের মতো বেশ খানিকটা খোলা জায়গা রয়েছে। সেখানে নির্মাণসামগ্রী রাখা। কয়েকটি চায়ের দোকানও গড়ে উঠেছে।
চারপাশে বহু নির্মাণাধীন বহুতল ভবন। এখানে মাদক ক্রেতা ও সেবীরা এসে বিশেষ ভঙ্গিতে মাথা বা কাঁধ চুলকাতে থাকেন। এরপর কোনো একটি ভবন থেকে বাঁশি বেজে ওঠে। ক্রেতারা মাদক কিনতে সেই বাড়ির দিকে চলে যান। এখানে বিক্রেতাদের সাধারণত প্রকাশ্যে দেখা যায় না। তাঁরা নির্মাণাধীন ভবনগুলোর কক্ষে অবস্থান করে খালি জায়গাটির দিকে নজর রাখেন।
জানা গেছে, এ এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন শরিফ মিয়া ও আল আমিন। এঁদের একটি সংঘবদ্ধ দল আছে। এঁরা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না হলেও এলাকার প্রভাবশালীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। সে কারণে তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। এলাকাবাসীও ভয়ে কিছু বলেন না। লেখকঃ মোহাম্মদ শামীম/ সাংবাদিক।
Leave a Reply