স্টাফ রিপোর্টার,আ. রহিম গাজী,রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী): পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী সমুদ্র উপকূলজুড়ে এখন ব্যস্ততার এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ভোরের আলো ফুটতেই গভীর সমুদ্র থেকে একের পর এক ফিশিং বোট ফিরে আসছে তীরে। বোটভর্তি ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা পড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন টাইগার চিংড়ি। জেলেদের ভাষায়, চিংড়ির গায়ে ডোরাকাটা দাগ থাকায় এর নাম হয়েছে ‘টাইগার চিংড়ি’। তীরে ভিড়তেই শুরু হয় আরেক কর্মযজ্ঞ। বোট থেকে নামানো তাজা চিংড়ি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে উপকূলের অস্থায়ী প্রক্রিয়াজাতকরণ ঘাটগুলোতে। সেখানে অপেক্ষায় থাকেন শত শত নারী শ্রমিক। তারা দক্ষ হাতে চিংড়ি বাছাই, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।
রাঙ্গাবালীর উপকূলীয় অঞ্চলে শুধু মাছ ধরা নয়, বরং টাইগার চিংড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চক্র। জেলে, নারী শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণির মানুষ এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তাদের হাত ধরেই যেমন স্থানীয় অর্থনীতি সচল হচ্ছে, তেমনি দেশের রপ্তানি খাতেও যুক্ত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। স্থানীয় কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, আগে সংসারের আয়-রোজগারে তাদের তেমন ভূমিকা ছিল না। কিন্তু এখন এই কাজের মাধ্যমে তারা নিয়মিত আয় করছেন। এতে পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা, বেড়েছে আত্মবিশ্বাসও। কেউ সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালাচ্ছেন, আবার কেউ সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে স্বামীর পাশে দাঁড়াচ্ছেন।
চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতে ব্যস্ত নারী শ্রমিক রাহিমা বেগম বলেন, “আগে ঘরের কাজই ছিল আমার সবকিছু। এখন টাইগার চিংড়ি বাছাইয়ের কাজ করে নিজেও আয় করতে পারছি। এতে সংসারের খরচ চালাতে স্বামীকে সহযোগিতা করতে পারছি, সন্তানের পড়ালেখার খরচও কিছুটা বহন করতে পারছি। আমাদের মতো অনেক নারী এখন এই কাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন।”
মৎস্য সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রক্রিয়াজাত করার পর চিংড়িগুলো পাঠানো হয় হিমাগারে। সেখানে নির্দিষ্ট মান বজায় রেখে সংরক্ষণ শেষে দেশের বিভিন্ন রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশের বাজারে পাঠানো হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হচ্ছে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা।
মাছ ধরার ট্রলার মালিক মো. হানিফ হাওলাদার বলেন, “আমরা গভীর সমুদ্রে গিয়ে অনেক কষ্ট করে টাইগার চিংড়ি আহরণ করি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো মাছ পাওয়া যায়, তখন আয়ও বাড়ে। তবে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। সরকার যদি আধুনিক সরঞ্জাম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা আরও ভালোভাবে মাছ আহরণ করতে পারবো এবং দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারবো।”
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. জহিরুন্নবী বলেন, “রাঙ্গাবালী উপকূলীয় এলাকায় টাইগার চিংড়ি আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ এ খাতকে আরও গতিশীল করেছে। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এই খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সমুদ্রের বুকে ধরা পড়া টাইগার চিংড়ি শুধু একটি জলজ সম্পদ নয়—এটি এখন রাঙ্গাবালীর মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
Leave a Reply